গণতন্ত্র-আলাপ পর্ব-২৪: বেগম রোকেয়াঃ কালের প্রাসঙ্গিকতায় "সুলতানার স্বপ্ন"
মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে এক রক্ষণশীল, মুসলিম ধনবান জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পুত্রদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করলেও কন্যাদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল। মূলত বড় দুই ভাই ও বোনের সমর্থন–সহায়তায় গৃহেই তাঁর শিক্ষালাভ ঘটে এবং তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করেন। স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের সহচর্যে তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তৃত হয়, এবং স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি দেশি–বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন এবং তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে।
সে যুগে কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামির কারণে বাঙালি মুসলমান মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে ছিল কড়া বিধিনিষেধ। সেই প্রেক্ষাপটে স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে তিনি প্রথমে ভাগলপুরে এবং পরে ১৯১১ সালে ৮ জন ছাত্রী নিয়ে কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় দুই যুগ ধরে বেগম রোকেয়া এই বিদ্যালয় পরিচালনায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। বিরূপ সমালোচনা ও নানাবিধ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে সে যুগের মুসলমান নারীদের শিক্ষালাভের অন্যতম পীঠস্থানে পরিণত করেন।
নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ও কবিতা রচনা করেন—যার মাধ্যমে তিনি নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, ধর্মের নামে নারীর প্রতি প্রবল অবিচার ও অমানবিকতার যুক্তিনির্ভর সমালোচনা করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবরোধবাসিনী নারীর করুণ চিত্র তিনি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন ‘আঞ্জুমান-এ-খাওয়াতীন-এ-ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সম্মেলনে তিনি বাংলাভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন—যা সে সময়ের আশরাফ মুসলিমদের উর্দু-প্রাধান্যের যুগে ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক উদ্যোগ।
সেই সামন্তীয় ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বেগম রোকেয়া আজীবন সংগ্রাম করেছেন নারীর অবরোধমুক্তির জন্য। তার এত বছর পর এসে “আধুনিক” বাংলাদেশে নারীর অবস্থা কী? নারী আজ স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, শিল্পে–প্রবাসে শ্রম দিচ্ছে, উচ্চপদে চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, খেলাধুলায় পুরুষদের আগে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করছে—এমনকি গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসককে উখাত করতেও সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের সেই অবরোধ কি সত্যিই দূর হয়েছে? আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের মানসপটে কি কোনো মৌলিক পরিবর্তন এসেছে? ধর্মীয় ওয়াজে আজও নারীর ঘরে আবদ্ধ থাকার কথা বলা হয়; নারীর ফুটবল খেলা বন্ধে হামলা হয়; নারীর পোশাক নিয়ে কটুক্তি করা হয় - দিনেদুপুরে রাস্তায় হেনস্থা পর্যন্ত করা হয়; নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করে ঘরে ফেরানোর তাগিদ শোনা যায়। নারী কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ হলে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রকাশ্য সমাবেশে অবমাননা করা হয়! রোকেয়ার গ্রাফিতিতে কালিমালেপন করা হয়, গালিগালাজ লেখা হয়, রংপুরে বেগম রোকেয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি ওঠে!
আসছে ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার ১৪৫তম জন্মদিন এবং ৯৩তম প্রয়াণ দিবস। রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আগামী ৭ ডিসেম্বর আমাদের পরবর্তী ‘গণতন্ত্র-আলাপ’-এ আমরা স্মরণ করবো বেগম রোকেয়াকে—তাঁর সময় ও বর্তমান সময় মিলিয়ে খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো, কেমন আছেন আজকের নারীরা। অবরোধবাসিনী ‘সুলতানাদের’ পুরুষতান্ত্রিক দাসত্ব / পিতৃতান্ত্রিক অবরোধ প্রথা থেকে মুক্তির স্বপ্ন কতখানি পূরণ হলো?
আমাদের গণতন্ত্র-আলাপের শিরোনাম: “বেগম রোকেয়া: কালের প্রাসঙ্গিকতায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’”।
আলোচনা করবেনঃ
সায়েমা খাতুন, লেখক ও নৃবিজ্ঞানী
ড. লুবনা ফেরদৌসী, শিক্ষক ও গবেষক
জান্নাতুল মাওয়া আইনান, লেখক ও গল্পকথক
সঞ্চালনা করবেনঃ
সোনিয়া আফরোজ যূথী, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক
আলাপটি দেখা ও শোনার জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই।