গণতন্ত্র-আলাপ ২১(১) : জুলাই সনদ বিতর্কঃ ঐক্য-বিভেদ, আশংকা ও সম্ভাবনা
২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রবল পরামক্রমশালী ফ্যাসিবাদী শাসকের পতন ঘটলেও, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাঝে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদ নির্মূল হয়নি। অভ্যুত্থানের সময়েই তাই আওয়াজ উঠেছিল রাষ্ট্র সংস্কারের, রাষ্ট্র মেরামতের। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল, এমন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের, যেখানে নতুন করে আর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসকের জন্ম হবে না! অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরও তাই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। সেই লক্ষ্যে তারা ১১ টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। সবগুলো কমিশন এরই মাঝে তাদের প্রতিবেদন ও সুপারিশ/ প্রস্তাবনাও প্রকাশ করেছে। এরপরে ৬ টি কমিশন (সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন) -এর সুপারিশগুলো বিবেচনা ও গ্রহণের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাকল্পে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। ৩৩ টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে ৮ মাসাধিক সময় ধরে আলাপ-আলোচনার পরে জুলাই সনদ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়, যেখানে রাষ্ট্র সংস্কারের ৮৪ টি প্রস্তাবনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়, বা নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করে। ৩০ টি দলের ২৪ টি দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও এনসিপি, গণফোরাম, সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও জাসদ স্বাক্ষর করেনি।
এই জুলাই সনদ ২০২৫ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, যেসব বিষয়ে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দল আপত্তি জানিয়েছে (বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে), সেগুলোর নিষ্পত্তি কীভাবে হবে – এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে কোনো সমঝোতা হওয়ার আগেই জুলাই সনদ স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সংসদকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার প্রদান করতে গণভোট করার বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে ঐকমত্য দেখা গেলেও, সংসদ নির্বাচনের সাথে একসাথে, নাকি সংসদ নির্বাচনের আগে আলাদাভাবে হবে, এ নিয়ে দ্বিমত দেখা যায়। অথচ, এই মতানৈক্য দূর করার আগেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয় এবং পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বাস্তবায়নের জন্যে ২টি বিকল্প প্রস্তাব করে, যেখানে ৮৪টির জায়গায় ৪৮ টি প্রস্তাবনা জায়গা পায়, এবং দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে দেয়। সেখানে প্রস্তাব করে, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া, প্রথম বিকল্পে তারা প্রস্তাব করে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন থেকে ২৭০ পঞ্জিকা দিনের মাঝে এই জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার করবে এবং এই সময়কালে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংস্কার করতে ব্যর্থ হলে জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে ও সংবিধান আইনরূপে কার্যকর হবে। স্বভাবতই এহেন প্রস্তাবনায় জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী কয়েকটি বড় দল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এছাড়া, গণভোট কখন হবে, তা নিয়েও দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য আরো তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদ সভা করে জানিয়েছে, গণভোটসহ বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। অন্যথায় সরকার নিজ থেকেই গণভোটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।
এমন পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অস্পষ্টতা, অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো কি এক সপ্তাহের মাঝে একমত হতে পারবে? একমত না হলে সরকারের সিদ্ধান্ত কি তারা মেনে নিবে? রাজনৈতিক দলগুলো কোন কোন প্রস্তাবনায় নোট ডিসেন্ট দিয়েছে, এবং কেন দিয়েছে? কোন কোন দল কোন সংস্কার চায়, কোন সংস্কার চায় না? কেন চায় না? যেসব প্রস্তাবনায় একমত হয়েছে, নির্বাচিত হলে সেগুলো যে বাস্তবায়ন করবে – তার নিশ্চয়তাই বা কী? আবার, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে বিল করে দিলেই কি হবে? তার কি কোনো আইনগত ভিত্তি থাকবে? বর্তমান সংবিধানের সাথে এই সংস্কারের সম্পর্ক কী হবে? ভবিষ্যতে আদালত কি এই সংস্কারগুলোকে বাতিল করে দিতে পারবে? এরকম নানা প্রশ্ন ঘুরছে। এসব নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের ধারাবাহিক গণতন্ত্র আলাপ পর্ব-২১। শিরোনামঃ “জুলাই সনদ বিতর্কঃ ঐক্য-বিভেদ, আশংকা ও সম্ভাবনা”। যেখানে আমরা ৭ পর্বে ধরে ধরে জুলাই সনদের ৮৪ প্রস্তাবনা এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যালোচনা করবো, তর্ক-বিতর্ক করবো। এর প্রথম পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে আগামি শনিবার, ৮ নভেম্বর। প্রথম পর্বের বিষয়ঃ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং “পটভূমি”তে বর্ণিত ইতিহাসের বয়ান।
আলোচনা করবেনঃ
মোস্তফা ফারুক, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক
আখতার সোবহান মাসরুর, ৯০ এর গণ অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা
পারভেজ আলম, লেখক ও গবেষক
জয়দীপ ভট্টাচার্য, সদস্য, কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরাম, বাসদ (মার্কসবাদী)
নাজমুল আহমেদ, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক
আজাদ হোসেন, আহবায়ক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন
অনুপম সৈকত শান্ত, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট
সঞ্চালনা করবেনঃ
তন্ময় কর্মকার, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক
সবাইকে আলাপটি শুনার আমন্ত্রণ জানাই।