গণতন্ত্র-আলাপ পর্ব-১৯ : আমাদের জুলাই
২০২৪ সালের জুলাই মাসের ৩৬ দিনে বাংলাদেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অবিস্মরণীয় গণজাগরণ-গণবিস্ফোরণ-গণঅভ্যুত্থানে পনের বছর ধরে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শাসকের পতন ঘটে! সেই আবেগ-উৎকন্ঠা ও অসীম সাহসিকতার দিনগুলিতে আমরা সরব-সক্রিয় থেকেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের মধ্যকার সম্মুখ লড়াইয়ের খবর, ছবি, ভিডিও ভেসে আসছিলো, আমরা সেগুলো বুকে ধারণ করছিলাম, ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সমস্ত রকম অপপ্রচার, প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে দিন রাত তর্ক বিতর্ক করছিলাম। ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর অবমাননাকর-মর্যাদাহানিকর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের প্রতিবাদে বলা “তুমি কে, আমি কে// রাজাকার, রাজাকার// কে বলেছে, কে বলেছে// স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।“ শ্লোগানকে দেখিয়ে যখন পুরো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকেই রাজাকার ট্যাগ দিয়ে, তাদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনীর নির্মম হামলা শুরু হয়েছিলো, আমরাও সেই শ্লোগান দিয়েছিলাম। সেই পাগলের মত দিনগুলোতে অনলাইনে কত বন্ধু হারিয়েছি, নতুন নতুন বন্ধু তৈরিও হয়েছে। ফ্যাসিবাদের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির একসাথে চলা যে সম্ভব নয়, আমরা বুঝে গিয়েছিলাম।
তারপরে শুরু হয় প্রতিরোধ পর্ব, হল ও ক্যাম্পাসগুলো থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধে ছাত্রলীগ পালাতে বাধ্য হতে থাকে, যা ভীষণ ক্ষিপ্ত করে ফ্যাসিস্ট শাসককে। গুলি চালায়। ক্যাম্পাসগুলো বন্ধ ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের পাশে তাদের অভিভাবকরা নেমে আসে। সর্বস্তরের জনগণ প্রতিবাদে-প্রতিরোধে বুক পেতে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ও সরকার দলীয় বাহিনী আরো নৃশংস হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক সব বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়! সেই সময়ে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হই, গোটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরি – বাংলাদেশ কী ঘটছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, দুনিয়ার দেশে দেশেও সংগঠিত হয়েছি, রাস্তায় নেমেছি, দূতাবাসগুলোর সামনে, মানবাধিকার কমিশনে, আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে গ্রেফতার হয়েছি। বাংলাদেশকে যখন আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি করা হচ্ছিলো, আত্মীয়-বন্ধু-স্বজন, দেশের মানুষের কোন খবরই যখন পাচ্ছিলাম না, আমরাও সিদ্ধান্ত নেই – তাহলে দেশে রেমিটেন্স পাঠাবো না, শুরু হয় রেমিটেন্স শাটডাউন কর্মসূচি। ফ্যাসিবাদী সরকারের ওপর তৈরি হয় বড় চাপ।
একসময় সরকার কোটা সংস্কারের সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু তখন আন্দোলন তখন আর কোটা সংস্কারের দাবির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিটা গুলির বিচার চেয়েছি, ৯ দফার পক্ষে দাঁড়িয়েছি। পুরো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লালে লাল করেছি। এই ৯ দফা থেকে ১ দফা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন স্বৈরাচারী-ফ্যাসিস্ট শাসকই নিরীহ জনগণের ওপর গুলি চালিয়ে গদি রক্ষা করতে পারেনি, ঊনসত্তুরে পারেনি, নব্বইয়ে পারেনি – আমরা জানতাম চব্বিশেও পারবে খন। পারেনি। ৩৬ জুলাই ভারত পালিয়ে যায় ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী; গণঅভ্যুত্থানের প্রাথমিক বিজয় ঘটে। বাংলাদেশ ঢুকে যায় আন্দোলনের নতুন পর্বে। গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ গঠনের এই সংগ্রাম আরো কঠিন ও তীব্র। “একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, সকলের জন্যে অংশগ্রহণমূলক (ইনক্লুসিভ) গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশে অবস্থানরত গণতন্ত্রকামী – মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামে আমরা পাশে দাঁড়াতে চাই। সেই জায়গা থেকেই আমরা প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই নেটওয়ার্কটি গঠন করছি“ – এই ঘোষণা দিয়ে গত বছর ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হয়।
এক জুলাই থেকে আরেক জুলাই, মাঝে কেটে গিয়েছে এক বছর। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হলো, তার কতখানি পূরণ হলো? বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে হাঁটতে পারছে, ফ্যাসিবাদী কাঠামো কি উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন পরিবর্তন এসেছে? সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে কোন ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে? বিচার প্রকৃয়াই বা কতদূর এগুলো? গত একবছরে আশান্বিত হওয়ার তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, উপরন্তু মবতন্ত্র, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখা যাচ্ছে। আদিবাসীদের ওপর, সংখ্যালঘু ধর্মী সম্প্রদায়ের ওপর, নারীদের ওপর আক্রমণ ও সহিংসতা তীব্র হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। সবমিলেই হতাশাকর পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। জুলাই অভ্যুত্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নানারকম প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। মেটিকুলাস ডিজাইন, কালার রেভ্যুলুশন, মার্কিন সহায়তায় রেজিম চেঞ্জ প্রভৃতি বলা হচ্ছে। অভ্যুত্থানের সময়ে পক্ষে থাকা, ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন চাওয়া লোকজনও কেউ কেউ এই হতাশার সময়ে তাদের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন! কারো কারো কাছে – ব্যর্থ অভ্যুত্থান!
জুলাইয়ের এক বছরে তাই জুলাইকে ধারণ করা খুব জরুরি। জুলাই ব্যর্থ নয়, দুনিয়ার কোন অভ্যুত্থানই আসলে ব্যর্থ হয় না। মূল বিষয় হচ্ছে – আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রামকে অব্যাহত রাখতে হয়, অভ্যুত্থানকে এগিয়ে নিতে হয় – সেই কাজটিই সবচেয়ে জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে জুলাইকে ধারণ করেই আমাদের এবারের গণতন্ত্র-আলাপ : “আমাদের জুলাই”। এখানে আমাদের নেটওয়ার্কের সদস্যরা বাংলাদেশে ও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছিলেন – সেই স্মৃতিচারণ করবেন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাগুলো যাতে ফিকে না হয়ে যায়, তাই সবাইকে সেগুলো মনে করিয়ে দিবেন। এবং গণঅভ্যুত্থানের এই এক বছরে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে বাংলাদেশ কতটুকু এগুতে পারলো, না পারলে কেন পারলো না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোই বা কোন ভূমিকা নিচ্ছে, জনগণের প্রকৃত মুক্তির পথ কী – এসব নিয়ে আমরা কথা বলবো।
আলোচনা করবেনঃ
মনির জামান রাজু (কানাডা)
তানবীরা হোসেন (নেদারল্যান্ডস)
শাহরিয়ার বিন আলী (যুক্তরাজ্য)
মীম আরাফাত মানব (স্পেন)
সোনিয়া আফরোজ যুথী (কানাডা)
কাজী তাফসিন (পর্তুগাল)
ইমরান নাদিম (সুইডেন)
সঞ্চালনা করবেনঃ
সানিয়া আফরিন (জার্মানি)