গণতন্ত্র-আলাপ পর্ব-১৭ : ফিরে দেখা জুলাই : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
২০২৪ সালের জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিস্ফোরণের নাম। এক দীর্ঘকালীন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখন কেবল একটি সরকারের পতন হয়নি—পতন ঘটেছে ভয়, নিস্তব্ধতা আর আত্মসমর্পণের সংস্কৃতির। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ছিল সেই জাগরণের প্রথম ধাপ, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল মানুষের ভেতরের সাহসের পুনর্জন্ম।
এই অভ্যুত্থান ছিল আপাত নেতৃত্বহীন, কিন্তু দিকহীন নয়। রাজপথে যেমন ছিল ছাত্রদের বজ্রকণ্ঠ, তেমনি অনলাইনে ছিল এক ঝাঁক সাহসী কণ্ঠস্বর—যারা তথ্যযুদ্ধ চালিয়েছেন, মিথ্যার মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছেন, এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়েও আগুন জ্বালিয়েছেন। তারা ছিলেন আন্দোলনের ডিজিটাল সৈনিক—লাইভে, পোস্টে, থ্রেডে, ভিডিওতে—প্রতিটি ক্লিকে তারা গড়ে তুলেছেন গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা, যেখানে মানুষের অধিকারের পক্ষে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই ছিল বিপ্লব।
কিন্তু আজ, এক বছর পর, আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি—এই অভ্যুত্থান কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে দিতে পেরেছে?
পুলিশ বাহিনী, যারা বছরের পর বছর জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের কাঠামোতে কোনো সংস্কার দেখা যায় নি। জনপ্রশাসন, যেখানে দলীয়করণ ছিল নীতির চেয়ে বড়, সেখানেও কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। বরং পুরনো আমলাতন্ত্রের ছায়া আরও গাঢ় হয়েছে।
ঐক্যমত্য কমিশন গঠিত হয়েছে—কিন্তু সেই ‘ঐক্যমত্য’ কতটা বাস্তব, আর কতটা কাগুজে? অনেক সুপারিশ এসেছে, কিছু আলোচনাও হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট, অনিশ্চিত। আর রাজনৈতিক দলগুলো? যারা একসময় একসাথে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছিল, আজ তারা নিজেরাই বিভক্ত, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। এই বিভাজন কি আমাদের মুক্তির পথ, নাকি নতুন দুঃশাসনের বীজ?
এই বাস্তবতায় আমরা ফিরে তাকাতে চাই সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা গত বছরের আন্দোলনে ছিলেন অনলাইন প্রতিরোধের অগ্রভাগে। তারা শুধু তথ্য ছড়াননি, তারা সাহস ছড়িয়েছেন। আজ আমরা তাদের কাছ থেকে শুনতে চাই—এই এক বছরে তারা কী দেখেছেন, কী ভেবেছেন, কী হারিয়েছেন, আর কী ধরে রেখেছেন?
আমরা চাই, এই আলোচনা হোক এক নতুন জিজ্ঞাসার সূচনা, যেখানে হতাশার মধ্যেও থাকবে প্রত্যয়ের আলো। কারণ আমরা জানি—স্বপ্ন ভাঙে, কিন্তু স্বপ্ন দেখা থেমে গেলে ইতিহাস থেমে যায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আমাদের এবারের গণতন্ত্র-আলাপের শিরোনামঃ "ফিরে দেখা জুলাই: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি"।
আলোচকঃ
দিলশানা পারুল, কোঅর্ডিনেটর, এনসিপি ডায়াসপোরা এলায়েন্স ও যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, এনসিপি
ইমতিয়াজ মির্জা, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট
পারভেজ আলম, লেখক ও গবেষক
সঞ্চালকঃ
তন্ময় কর্মকার, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক