গণতন্ত্র-আলাপ ১৬: জুলাই মর্সিয়াঃ "বুক পেতেছি গুলি কর"
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের জনমনে একটা গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়ে গেছে। আমরা দেখেছি পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে নিরস্ত্র ছাত্রজনতার বুকে, আমরা দেখেছি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার দৃশ্য; যেই সেনাবাহিনী দেশের মানুষকে রক্ষার শপথ নিয়েছিলো সেই সেনাবাহিনী কী অবিশ্বাস্যভাবে দেশের মানুষের বুকে অস্ত্র ধরলো সেই দৃশ্য আমাদেরকে দেখতে হয়েছে, আমরা দেখেছি একটা অর্ধমৃত শরীর টেনে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশের অত্যাধুনিক সাঁজোয়া যানের ছাদে। তারপর সেইখান থেকে ছুড়ে ফেলা হলো মানুষটাকে। মুমূর্ষু মানুষটির তখন ফুসফুসে জমানো শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করতে করতে আমাদেরকে জানান দিয়ে যান তিনি বেচে ছিলেন। একজন নিরস্ত্র নাগরিককে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি সেই দেশেরই আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, তার মৃত শরীরটাকে পর্যন্ত শেষ সম্মান করার প্রয়োজন মনে করে নাই। এরপরে গোটা জুলাই জুড়ে আমরা দেখেছি সহস্রাধিক লাঞ্ছিত মৃতদেহ; পিকাপ ভ্যানে পোড়া শরীর, রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা মৃতদেহ, পিচঢালা রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ। দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছি। সবকিছু ঘটেছে শুধুমাত্র দেশের একটা অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক দল এবং দলটির সহায়কদের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার তাড়নায়।
এরপরে আমরা কী দেখেছি? আমরা আওয়ামী লীগ এবং তার সহায়কদের অবিশ্বাস্য রকম ডিনায়াল দেখেছি। তারা দুঃখিত হয় নাই, বরং নিহত শহীদদেরকে তারা কেউ কেউ দেশদ্রোহী বলার চেষ্টা করে চলছেন প্রতিনিয়ত। এই দলটির নেতৃস্থানীয় কেউ একবারের জন্যেও ভুলেও দেশের জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ করে নাই। গত জুলাই থেকে এই জুলাই পর্যন্ত এখনো বাংলাদেশের জনগণের এই ক্ষততে কেউ স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয় নাই। একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতায়, হিসেব নিকেশের মাঝখানে আরো অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সবমিলিয়ে আমাদের ট্রমার বোঝা পাহাড়সম। আমরা গলাছেড়ে মাতম করতে পারি নাই, বিলাপ করতে পারি নাই আমাদের লাঞ্ছিত শহীদদের জন্য।
এমনকি আজকাল আমরা মাতম করতেও ভয় পাই, কারণ দেশে দেশে যুগে যুগে আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের ট্রমা ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের ট্রমা নিয়ে রাজনীতি হয়, আমাদের মৃতদেহগুলো হয়ে যায় কেবল কয়েকটি সংখ্যা। তাই আগামী ১৯ জুলাই শনিবার রাতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক আয়োজন করছে জুলাই মর্সিয়ার, শিরোনামঃ জুলাই মর্সিয়া : "বুক পেতেছি গুলি কর"! সেখানে আমরা আমাদের গল্পগুলো আবার স্মরণ করবো। ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে, একটি মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবার পথে আমরা আমাদের ট্রমা নিরাময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব নিয়ে ডিল করতে চাই। আমাদের অঙ্গীকার হবে, আর যেন কখনোই ক্ষমতার রাজনীতির বলি না হয় দেশের সাধারণ মানুষ, আর যেন কখনওই দেশের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে রাস্তায় দেশেরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বুলেটের সামনে দাঁড়াতে না হয়।
জুলাই মর্সিয়ায় কথা বলবেনঃ
শহীদ জননী (শহীদ নাঈমা সুলতানার মা) আইনুন নাহার,
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ,
জুলাইয়ের আহত সম্মুখযোদ্ধা তাবাসসুম,
নেত্র নিউজের ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি জীবন আহমেদ।
সঞ্চালনা করবেনঃ
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের সদস্য জান্নাতুল মাওয়া আইনান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর উপলক্ষে আমাদের ধারাবাহিক দ্বিতীয় আয়োজনে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই।