নাগরিক বিবৃতিঃ খাগড়াছড়িতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সশস্ত্র বাহিনী ও সেটেলার বাঙালির হামলা, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা ও প্রতিবাদ
আমরা, বাংলাদেশ ও প্রবাসে বসবাসকারী উদ্বিগ্ন নাগরিক, খাগড়াছড়ি জেলায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং সেটেলার বাঙালি কর্তৃক সহিংসতার তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলার সিঙ্গিনালায় মারমা সম্প্রদায়ের একজন কিশোরীকে তিনজন সেটেলার বাঙালি সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। এই জঘন্য অপরাধের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও শাস্তির পরিবর্তে প্রশাসনিক নীরবতা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। এর প্রতিবাদে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’র ব্যানারে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। কিন্তু অবরোধ চলাকালীন ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিরীহ ও নিরস্ত্র প্রতিবাদকারী আদিবাসী সাধারণ জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা, আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় কমপক্ষে ৩ জন নিহত ও পঞ্চাশের অধিক আহত হয়েছেন। গুইমারার রামেসু বাজারে আদিবাসীদের মালিকানাধীন দোকানগুলোতে সেটেলার বাঙালি ও ‘মুখোশ পড়া’ ব্যক্তিরা আগুন ধরিয়ে দিলে অন্তত ৩০টি দোকান পুড়ে যায়, সাথে আগুন ধরে যায় আশেপাশের বসতঘরেও। বিভিন্ন দোকানপাটে লুটপাটের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। আদিবাসী নারীর ধর্ষণের ঘটনার সাথে যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমন করতে প্রতিবাদকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর এমন নির্বিচার গুলিবর্ষণ, এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে ও প্রত্যক্ষ মদদে বাঙালি সেটেলার কর্তৃক এমন নৃশংস সহিংসতায় আমরা বাকরুদ্ধ!
আমরা দৃঢ়ভাবে বলছি—একজন আদিবাসী নারী ধর্ষণের বিচারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে বরং প্রতিবাদী জনগণের ওপর গুলি চালানো, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটি বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ৩১, ৩২, ৩৫), নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও সনদ (বিশেষ করে ICCPR, CEDAW, CRC)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই যে, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী শাসকের পতনের পরেও বাংলাদেশের পাহাড়ী আদিবাসীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গীর আদৌ কোন পরিবর্তন হয়নি। ধর্ষণ, আদিবাসীদের সম্পদ রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে মারণাস্ত্রের ব্যবহার মানবাধিকারের প্রতি সরকারি উন্নাসিকতা ও উদাসীনতার প্রকাশ এবং এটাই প্রমাণ করে যে, আদিবাসীদের ব্যাপারে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের বৈষম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করে চলেছে।
আমরা আরো ক্ষুদ্ধ হয়ে লক্ষ্য করছি যে, এরকম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি বাংলাদেশের প্রধানতম সংবাদ মাধ্যমসমূহে যথাসময়ে ও যথাযথ গুরুত্ব সহকারে প্রচার এবং প্রকাশ করা হচ্ছে না। বরং, আদিবাসীদের প্রতিবাদকে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় বিঘ্নিতকরণ হিসাবে দেখানোর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেটেলারদের অপরাধকেও লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অতীতের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের ধারাবাহিকতাতে মজলুমের কণ্ঠকে ক্ষীণ অথবা বিলীন করার চিত্র অবিকল বজায় আছে।
আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক ও মানব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়া এবং মানুষ হিসাবে তাঁদের সকল নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় নেই। আমরা দাবি তুলছি –
১। অভিযুক্ত ধর্ষণকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার করতে হবে। ধর্ষণ সার্ভাইভারের সম্পূর্ণ চিকিৎসা এবং তার ও তার পরিবারের মানবিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
২। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
৩। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে গুলিবর্ষণকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ও হুকুমদাতা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়িদের ধরপাকড়, ‘উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া’ বন্ধ করতে হবে এবং যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাঁদেরকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। আদিবাসীদের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে।
৪। হামলা ও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
৫। পার্বত্য অঞ্চল থেকে পরোক্ষ সেনাশাসনের অবসান ঘটাতে হবে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দাদের মাধ্যমে জনজীবন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নিতে হবে। আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।