নাগরিক বিবৃতিঃ অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সব্যসাচী’র স্টলে আক্রমণের নিন্দা ও প্রতিবাদ
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আজ ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের ন্যাক্কারজনক আক্রমণ এবং প্রকাশনীর প্রকাশক ও লেখক শতাব্দী ভবকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। গতকাল (৯ ফেব্রুয়ারি) থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব্যসাচী স্টলে তসলিমা নাসরিন সহ “নাস্তিক্যবাদী ও শাতিমদের বই” প্রকাশের অভিযোগ তুলে উসকানি দেয়ার পরেও সব্যসাচী স্টলের কোন রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারার ব্যর্থতার দায় বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের এবং অন্তর্বতীকালীন সরকারকেই নিতে হবে।
অথচ ফ্যাসিবাদী শাসকের পতনের পরে এই বইমেলা নিয়ে আমাদের আশা ছিল সকল চিন্তা ও মতের প্রকাশ মুক্ত ও অবারিত হবে, এবং সকল লেখক-প্রকাশক নির্ভয়ে নিজেদের বই প্রকাশ, পরিবেশন ও বিক্রয় করতে পারবেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপরে এমন আঘাতের ঘটনায় আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও আমরা একইভাবে একুশে বইমেলার উপরে বারংবার আক্রমণ ঘটতে দেখেছি। শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকিতে রোদেলা, শ্রাবণের মত প্রকাশনী বন্ধ করে দেওয়া ও বই নিষিদ্ধ করার মত ঘটনা ঘটেছিলো। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে বইমেলা থেকে ফেরার পথে অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতাতেই স্বাধীন মত ও মুক্তচিন্তা প্রকাশের উপর এই আক্রমণ। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জায়গায় আজ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কখনো তারা নারীদের ফুটবল খেলায় বাধা দিচ্ছে, আক্রমণ করছে, আবার কখনো পতিত ফ্যাসিবাদের প্রতীক-স্থাপনার প্রতি জনগণের ক্ষোভপ্রকাশের সুযোগ নিয়ে সেখানেই অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর শুধু নয়, কৃষকের ভাস্কর্য সহ নানা রকম ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারকে ভাংচুর চালাচ্ছে, সেসব স্থাপনায় মসজিদ স্থাপনের ঘোষণা দিচ্ছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি তুলছে, সারাদেশে একের পর এক মাজারের উপরে হামলা ও আক্রমণ চলছে। তৌহিদি জনতাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের হুমকি-ধামকিতে প্রশাসন নিরাপত্তা বিধানের পরিবর্তে ওরস শরীফ ও মেলা বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার জননিরাপত্তা প্রদানে, বিশেষ করে সকল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। এর ফলে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি বিশ্বে বাংলাদেশকে জঙ্গীবাদের কবলে যাওয়া দেশ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চরমভাবে ব্যর্থ সরকার হিসেবে দেখাতে পারছে এবং এভাবেই তারা দেশে ও বিদেশে নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেস্টা করতে পারছে।
এমতাবস্থায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী এবং অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা বাংলাদেশের সমস্ত স্তরের জনগণের প্রতি আমাদের আহবান, দেশে ও বিদেশে আওয়ামী এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের নানারকম চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও উসকানিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করুন। দেশের বাইরে থেকে যারা নানাভাবে উসকানি দিচ্ছেন, প্রকারান্তরে তারা দেশে বিভক্তির রাজনীতি তৈরির মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন, তাদের হাতেই নানারকম অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন, সরকারকে বিপদে ফেলছেন এবং এভাবে গণঅভ্যুত্থানকেই দুর্বল করে ফেলতে ভূমিকা রাখছেন। ফলে, যেকোন ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উসকানি থেকে সবাইকে সাবধান থাকার আহবান জানাই।
আমরা নিম্নলিখিত দাবিসমূহ উত্থাপন করছি:
১। ঘোষণা দিয়ে পুলিশ ও মিডিয়ার সামনে চালানো, বইমেলায় এই আক্রমণের সাথে জড়িত সকলকে অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
২। সকল ধরণের মত ও পথের বই প্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যেকোন ধরণের ফ্যাসিবাদী হামলা মোকাবেলায় বইমেলা ও প্রকাশনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোন গোষ্ঠীর উসকানি, দাবি বা হামলায় কোন অবস্থাতেই যাতে কোন স্টল সাময়িকভাবেও বন্ধ না হয় এবং যে মহাপরিচালক এটি নিশ্চিত করতে পারবেন না, ধরে নিতে হবে – বাংলা একাডেমির সেই মহাপরিচালক স্বপদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।
৩। সারাদেশে মাজার, ওরস শরীফ ও মেলার উপরে আক্রমণ, নারী ফুটবলের ওপরে হামলা এবং বিভিন্ন ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারকে ভাংচুরের সাথে জড়িত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে, কোন উপদেষ্টার ফেসবুকীয় হুমকি-ধামকি’র চাইতেও সরকারের তরফ থেকে কার্যকর ভূমিকা দেখতে চাই। এসব অপরাধের সাথে যুক্ত তৌহিদি জনতাসহ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের “ডেভিল” হিসেবে নয়, বরং “অভিযুক্ত” ও প্রমাণের ভিত্তিতে “অপরাধী” হিসেবে সাব্যস্ত করা হোক, এবং তাদেরকে “হান্ট” না করে গ্রেফতার করে বিচারের ব্যবস্থা করা হোক, মানে প্রমানিত হলে আইনানুযায়ী সাজার ব্যবস্থা করা হোক।
৪। অবিলম্বে সারাদেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে হবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।