বিবৃতি : মোহাম্মদপুরে নারী লাঞ্ছনায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং নারী লাঞ্ছনাকারী অপরাধীদের তথা “মব”কে সমর্থনকারী ও ভিক্টিম ব্লেমিং করা, জনগণকে নিরাপত্তা প্রদানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অথর্ব-অপদার্থ-মূর্খ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অনতিবিলম্বে অপসারণের দাবি
মোহাম্মদপুরে নারী লাঞ্ছনায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং নারী লাঞ্ছনাকারী অপরাধীদের তথা “মব”কে সমর্থনকারী ও ভিক্টিম ব্লেমিং করা, জনগণকে নিরাপত্তা প্রদানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অথর্ব-অপদার্থ-মূর্খ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অনতিবিলম্বে অপসারণের দাবিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের বিবৃতি
৩ মার্চ, ২০২৫
গত শনিবারে (১ মার্চ) মোহাম্মাদপুরের লালমাটিয়ায় আড়ংয়ের পাশের একটি চায়ের দোকানে দুই নারীর চা-সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে পাশ দিয়ে যাওয়া রিংকু নামে একজন ব্যক্তির মোরাল পুলিশিং, “বেশ্যা” বলে গালাগালি, নারীদের ওপর “মব” জড়ো করে হামলা-আক্রমণের মত ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিতে হলেও, পুলিশ হামলাকারী অপরাধীদের এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি। অথচ, গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হামলার ব্যাপারে বলেন,
“দুই নারীর উপরে হামলা হয়েছে। ওটার ক্ষেত্রে আমি যতটুকু জানি, ওই দুই নারী সিগারেট খাচ্ছিলেন। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি নামাজে যাওয়ার সময় তাদের বাধা দেন এবং চা ছুড়ে মারেন। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ওপেন জায়গায় ধূমপান নারী-পুরুষ সবার জন্য নিষিদ্ধ। এটা কিন্তু একটা অফেন্স। এই জন্য আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করবো, ওপেনে যেনো কেউ সিগারেট না খায়। আর এখন এই যে রোজার সময় সবারই একটু সংযমী হতে হবে। বাইরে যেন কেউ খাবারটা না খায় এ বিষয়ে আমাদের ধর্ম উপদেষ্টাও কিন্তু অনুরোধ করেছেন। এটা যারা রোজা থাকছেন তাদের জন্য একটা সম্মান প্রদর্শন করা।”
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ অনুযায়ী পাবলিক প্লেস- এ ধূমপান করা অপরাধ (অফেন্স) হলেও, এই আইনের ধারা ২ (চ) অনুযায়ী “পাবলিক প্লেস” এর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেখানে টঙ চায়ের দোকান পড়ে না। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা “ওপেন” জায়গায় ধূমপান করা নারী ও পুরুষ সবার জন্য নিষিদ্ধ বললেও, কোন পুরুষকে ধূমপান করার জন্যে কখনো এরকম মোরাল পুলিশিং, “বেশ্যা” বলে গালাগালি ও আক্রমণ এর সম্মুখীন হতে হয়েছে কি? তাছাড়া, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যে অফেন্স এর কথা বলেছেন, সেই অফেন্স বা অপরাধে কেউ যুক্ত হলে তাকে আইনটির ধারা ৪ (২) অনুযায়ী অনধিক তিনশত টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় করার কথা হয়েছে এবং পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে অপরাধীকে দণ্ডিত করার ক্ষমতা রাখেন কেবল ও কেবলমাত্র “কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা”, মোটেও “স্থানীয় কিছু ব্যক্তি”র এই এখতিয়ার নেই। অথচ, আমাদের দণ্ডবিধির ৫০৪ ও ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ঐ দুই নারীকে “বেশ্যা” বলে গালাগালি করা, এবং ৩৫৪ নাম্বার ধারা অনুযায়ী তাদের ওপরে হামলা ও লাঞ্ছনা করা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ। অর্থাৎ, আমাদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্টতই ভুলভাবে ঐ দুজন নারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন এবং তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধকে কেবল আড়াল ও অস্বীকারই করেননি, বরং হামলাকে “নামাজে যাওয়ার সময় বাধা” প্রদান হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে পক্ষাবলম্বনও করেছেন ও দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শুধু তাই নয়, “রোজার মাসে সংযমী” হওয়ার কথা বলার মাধ্যমে সেই “মোরাল পুলিশিং” ও “মব”জাস্টিসেরই পুনরুচ্চারণ করেছেন।
বর্তমান এই অন্তবর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সারাদেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় সারাদেশে সমস্তরকম অপরাধ বেড়েছে। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী সারাদেশে একের পর এক মাজারে হামলা চালাচ্ছে, মাজারগুলোতে নির্বিঘ্নে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে যাচ্ছে, কিন্তু আইন-শৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসন জানমালের নিরাপত্তা প্রদানে ও অপরাধীদের গ্রেফতারে কোন ভূমিকাই পালন করছে না। বরং, বিভিন্ন জায়গায় তৌহিদি জনতা, হেফাজতে ইসলামী সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবিতে ওরশ শরীফ বন্ধ করে দিয়েছে বা ওরশের অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। মুরতাদ বা শাতিম ঘোষণা করে বিভিন্ন জনকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে, অথচ হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধেও কোনরকম ভূমিকা নেয়া হচ্ছে না। সারাদেশে নারীদের ওপর হামলা-আক্রমণ, যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণ ভয়ানকভাবে বেড়ে গিয়েছে, চলন্ত বাসে ডাকাতি ও নারী ধর্ষণের মত ঘটনাও ঘটেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। উপরন্তু, তিনি নারীর ওপর হামলাকারীর ভাষায় কথা বলেছেন, আক্রমণের শিকার নারীকেই অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসে নারীর উপরে সহিংস অপরাধকে বৈধতা দিতে নিজে মোরাল পুলিশিং করার মাধ্যমে দেশজুড়ে চলমান “মব জাস্টিস”-”মব লিঞ্চিং”কেই উৎসাহিত করেছেন, উসকানি দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এহেন বক্তব্য ও আচরণকে আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করছি, তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অনতিবিলম্বে এই ব্যর্থ-অথর্ব ও মবজাস্টিসে উসকানি-দাতা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছি। একই সাথে রিংকু নামের ব্যক্তিসহ মোহাম্মাদপুরের দুই নারীর ওপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার, এবং সারাদেশে দ্রুত আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি জানাচ্ছি।