ঘোষণাপত্র
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক
ভূমিকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। ছাত্র-জনতার বুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাখির মত মানুষ মেরেও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেননি, অবশেষে গত ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। আর পেছনে রেখে যান ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার নিষ্পেষণে ভঙ্গুর ও প্রায় অচল এক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
যেখানে একচেটিয়া দলীয়করণ, লাগামহীন দুর্নীতি ও গণতন্ত্রহীনতায় নিমজ্জিত রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান হয়েছে অকার্যকর ও গণবিরোধী। যেখানে ব্যাংকিং খাতে চরম অব্যবস্থপনা ও সীমাহীন লুটপাট, উন্নয়নের নাম করে বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশী ঋণের বোঝা, জ্বালানিখাতসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার উজাড় করা ব্যবসা, আর দেশ থেকে বিপুল অর্থপাচারে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরস্থিতি একেবারেই সঙ্গীন! যেখানে নানারকম পরীক্ষা-নীরিক্ষায় ও সাম্রাজ্যবাদী দাতাদেশগুলোর প্রেসক্রিপশনে আর ফ্যাসিবাদী সরকারের খামখেয়ালিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে।
ফলে, সুযোগ এসেছে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার, গণতান্ত্রিক – বৈষম্যহীন – সকলের জন্যে অন্তর্ভূক্তিমূলক ও অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশ নির্মাণের। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষাও হচ্ছে এরকম এক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্যে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার বা মেরামতের। এবারের এই গণঅভ্যুত্থানের বিশিষ্টতা হচ্ছে এই যে, প্রথমবারের মত দৃশ্যমান কোন রাজনৈতিক দল বা জোটের নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থানটি ঘটেনি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে মূলত ছাত্রসমাজ এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদান করলেও, একটা পর্যায়ে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা এই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে!
ফলে, ছাত্র-জনতার বিজয়ের পরে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণঅভ্যুত্থানে চালানো গুলি ও ফ্যাসিবাদী শাসনের যাবতীয় অপকর্মের তদন্ত ও বিচার, এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও, ছাত্র-জনতা ঘরে ফিরে গিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকে নি, বরং প্রতিনিয়ত জাগ্রত ও সরব থাকছে, রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে জানান দিচ্ছে, এবং অনেকক্ষেত্রে এই সরকারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতাও করছে। এটি যেমন প্রবল সম্ভাবনার জায়গা, তেমনি জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার মতো কোন সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি না থাকায়, একরকম অনিশ্চয়তা, সংশয়ের জায়গাও রয়েছে। আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসন কাঠামো এখনো বিরাজ করছে।
স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৩ বছর ধরে এদেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে আমাদের দেশে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলতঃ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মাসগুলোতে আইন-শৃংখলার নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সারাদেশে নানারকম অপতৎপরতাও দেখা দিয়েছে। সনাতনী, আদিবাসী, সুফি, মাজারপন্থী, ফকিরি, আহমেদিয়া, শিয়া, সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত প্রান্তিককৃত জনগোষ্ঠীর ওপরে হামলা-আক্রমণ, এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। নারী ও লিঙ্গীয় প্রান্তিককৃতদের লক্ষ করেও অনলাইনে-অফলাইনে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চলেছে, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। আবার এর বিপরীতে সাধারণ মানুষকে রুখে দাঁড়াতেও দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, সকলেই কথা বলা শুরু করেছেন। ফলে, আশা-আকাঙ্ক্ষা-সম্ভাবনা ও আশংকা-অনিশ্চয়তা পাশাপাশি চলছে। দেশের এই সন্ধিক্ষণে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিটেন্সপ্রবাহ। প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাদের রক্ত ঘাম করা পরিশ্রমে পাঠানো রেমিটেন্সে ফ্যাসিবাদী আমলের পুকুরচুরি লুটপাটের পরেও দেশের অর্থনীতিকে কেবল টিকিয়েই রাখেনি, এই গণঅভ্যুত্থানেও ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পতনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ১৭ জুলাইয়ের পরে ইন্টারনেট – মোবাইল নেটওয়ার্ক সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশকে গোটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো, সেই সময়টিতে প্রবাসী বাংলাদেশীরা সরব থেকেছে। তারা রেমিটেন্স পাঠানো বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী সরকারের ওপরে প্রবল চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও বিভিন্নদেশে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এমনই বিক্ষোভ করতে গিয়ে ৫৭ জন প্রবাসী বাংলাদেশী গ্রেফতার হয়েছিলেন ও ফ্যাসিবাদী সরকারের প্ররোচনায় দ্রুততমসময়ে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজার সম্মুখীনও হয়েছিলেন (সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কুটনৈতিক তৎপরতায় তারা মুক্ত হয়েছেন)। অর্থাৎ, প্রবাসী বাংলাদেশীরা বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে অবস্থান করলেও, দেশকে প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেন এবং একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন তারা দেখেন।
আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশী, যারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা পতনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব থেকে ও প্রবাসে সক্রিয় কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্নভাবে সমর্থন যুগিয়েছি, দেশের এই সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রতিটি বাংলাদেশীর ওপরে যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসে হাজির হয়েছে, আমরা প্রবাসে অবস্থান করেও সেই দায়িত্ব অনুভব করছি। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, সকলের জন্যে অংশগ্রহণমূলক (ইনক্লুসিভ) গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশে অবস্থানরত গণতন্ত্রকামী – মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামে আমরা পাশে দাঁড়াতে চাই। সেই জায়গা থেকেই আমরা প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই নেটওয়ার্কটি গঠন করছি।
দল, মত, জাতি, লিঙ্গ, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, ধর্ম ও বিশ্বাস নির্বিশেষে বাংলাদেশের বাইরে যেকোন দেশে বসবাসকারী যেকোন বাংলাদেশী, যারা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে একমত হবেন, তারাই এই নেটওয়ার্কের সদস্য হতে পারবেন।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
আমরা বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার”-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চাই এবং ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার “বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সকলের জন্যে অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ” নির্মাণ করতে চাই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। দেশের প্রতিটি মানুষ, সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে প্রান্তিকজনও যে একজন মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদার অধিকারী, এই রাষ্ট্র ৫৩ বছরে তা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় সামাজিক সুবিচার হয়েছে ভূলুণ্ঠিত। তাই, মুক্তিযুদ্ধের এই অপূরিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নই আমাদের উদ্দেশ্য।
তার জন্যে দরকার সবরকম বৈষম্যের অবসান। আমরা এমন এক অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে চাই, যেখানে সবরকম ধর্মীয় মত, পথ ও বিশ্বাসের মানুষ সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারবেন, প্রত্যেকের ধর্মীয় ও মত প্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শুধু সহনশীলতাই নয়, সহাবস্থানও নিশ্চিত করা হবে। সকলের জন্যে অংশগ্রহণমূলক বা ইনক্লুসিভ সমাজ বলতে আমরা বুঝি মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, নাস্তিক, নারী, পুরুষ, রূপান্তরকামী, রূপান্তরিত, আন্তঃলিঙ্গ, হিজড়া, বাঙালি ও আদিবাসী সকল জাতিগোষ্ঠী, বিষমকামী, সমকামী, উভকামী ও অ্যাসেক্সুয়াল - এরকম বহুধারার প্রতিটি নাগরিকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সমান অধিকার এবং অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে এমন এক সমাজ। আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে আর কখনোই ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারবে না। যেখানে নতুন কোন শেখ হাসিনার জন্ম হবে না।
- ক) বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
- খ) আনসার-ভিডিপি, পুলিশ, বিজিবিকে স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে পরিচালনা, প্রত্যেকের স্বতন্ত্র দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্র নিশ্চিতকরণ, এবং কোন অবস্থাতেই জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দমনের কাজে শাসকদলের নিপীড়ক বাহিনী হিসেবে ভূমিকা রাখতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
- গ) স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন, যার নিয়োগ, অপসারণ কিংবা পদোন্নতিতে নির্বাহী বিভাগের কোন হস্তক্ষেপ থাকবে না।
- ঘ) স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন।
- ঙ) জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজানো। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলির ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ মুক্ত করে, দক্ষতা - যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা বা অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করা।
- চ) অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ মুক্তকরণ।
কাজের ক্ষেত্র বা কর্মপরিধি
রাষ্ট্র মেরামতের কাজটি রাজনৈতিক কাজ, ফলে এর জন্যে দরকার রাজনৈতিক শক্তি। প্রবাসে অবস্থান করার কারণে আমাদের পক্ষে সেই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না (যেমনঃ সংসদে বা সরকারে গিয়ে আইন পরিবর্তন)। ফলে, আমাদের ভূমিকা হবে পরোক্ষ, অর্থাৎ সহযোগিতামূলক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও একটি সংঘবদ্ধ প্রেশারগ্রুপ হিসেবে।